আবার দেখা হবে

আমার কবি হওয়ার কথা ছিল
ময়লা রঙচটা কুর্তা, আধময়লা জিন্স,
ঝাঁকড়া চুলের শহুরে কবি।
কত রাত শব্দের সাথে প্রেম করেছি,
নগরের অলিগলিতে ছন্দ হাতড়েছি,
নাহ, সনেট আমার মেলেনি।
আমাকে বাবু সেজে বিক্রি করতে হয়েছে মিথ্যা।

আমার এক শিক্ষিকা বলতেন, আমার লেখক হওয়ার কথা আছে, মস্তবড় লেখক।
আমার বাক্যরা বুকের ভেতর জীবন্ত হয়ে ওঠে।
লেখক হতে আমার তাড়নাও কি কম ছিল!
গাঁয়ের মেঠোপথে আমি চরিত্র খুঁজেছি,
চরিত্র খুঁজেছি ভিড় বাসের কথোপকথনে,
ক্লান্ত পথিকের ঘামে কিংবা টোকাইয়ের বস্তায়।
আমি প্লট হাতড়েছি কত নর্দমায়, ডাস্টবিনে।
না আমার চরিত্র মিলেছে,
না জমেছে প্লট।
স্যারের হুকুম তামিল করে করে আমার বছর ফুরায়।

ভেঙে যাওয়া প্রেমে জমে থাকা আমার প্রেমিকা বলেছিল, 
তুমি রঙিন প্রজাপতি হবে।
প্রজাপতি হতে আমি কত ফুল স্পর্শ করে পুড়ে গিয়েছি,
গায়ে মেখেছি রামধনুর সাতরঙ।
গন্ধ নিতে নিতে আমার অ্যালার্জিতে হাঁচি এসেছে,
হায়, প্রজাপতি হয়ে আকাশে পাখা মেলা হয়নি।
আমি এখন ডেবিট-ক্রেডিটে শূন্য মেলাই দুপাশে।

চায়ের আড্ডায় বন্ধুরা বলতো,
তুই একদিন অনেক বড় হবি,কত মেধাবী তুই!
আমার নাকি বড় হওয়ার কথা আছে।
বড় হতে গিয়ে আমি দিনে দিনে ছোট হয়েছি।
চেহারায় জমেছে রুক্ষতার পুরু আস্তর।
কথায় শতভাগ কর্পোরেট কপটতা।
বড় হওয়া হয়ে ওঠেনি,
আমি এখন মেকি গ্ল্যামারের ফেরিওয়ালা।

শাড়ীর আচলে ঘাম মুছতে মুছতে মা বলতেন,
আমার ছেলে মানুষের মতো মানুষ হবে।
মানুষ হতে আমিও চেষ্টা করিনি, তা নয়।
কত অসহায়ের পাতে ভাত তুলে দিয়েছি,
হাত-পাতা ভিক্ষুকের থালায় পয়সা তুলেছি,
অবহেলিত শিশুকে আইসক্রিম কিনে দিয়েছি।
বড় হতে পারিনি,
অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের প্রতিবিম্ব দেখে পালিয়ে যাই।

মাঝরাতের নির্জনতায় ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে আমি নিজেকে বলতাম,
একদিন ভবঘুরে হবো।
আমার ভবঘুরে হওয়ার কথা ছিল।
পথে প্রান্তরে জীবনের স্বাদ নিতে নিতে হারিয়ে যাব।
কখনো পাহাড়ে বসে সমুদ্র দেখব,
কখনো সমুদ্রের পাশে বসে পাহাড়।
বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজতে ভিজতে
প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দেব কদমের ভালোবাসা।
ভবঘুরে হয়ে হারাতে পারিনি।
যান্ত্রিক শব্দে চোখ ডলে আজও ঘুম ভাঙে ক্লান্তিতে।

আমি শেষমেশ ব্যর্থতা হয়ে টিকে গিয়েছি।
অর্ধেক সমাপ্ত কবিতা,
কখনো না লিখতে পারা উপন্যাস,
বৃদ্ধি না পাওয়া শুয়োপোকা,
ছোট মনের সংকীর্ণতা,
অমানুষী মানবতা,
ভবঘুরে মনের বিষণ্নতা—
আমার একান্ত পরিচয়।

আমি এখন সন্তান মানুষ করতে না পারা পিতার পরাজয়।
প্রেমে প্রতারিত নারীর আর্তচিৎকারের নিস্তব্ধতা।
ভাত জুটাতে না পারা শ্রমিকের ভাবলেশহীন চোখ।
ফুল ফোটাতে না পারা বৃক্ষের অনর্থকতা।

মানুষ হয়েছি ঠিক,
শুয়োপোকার মতো,
নেড়ি কুকুরের মতো,
ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা মাকড়সার মতো।
মেসোর মতো আমি অপাংক্তেয়, অশুচি,
সিসিফাসের মতো অভিশপ্ত।
পাথর ঠেলে উপরে তুলি দিনভর,
আমার পথ ফুরায় না।

আমি ভবঘুরে হতে পারিনি,
হবো বলে কতবার হারাতে চেয়েছি!
সংসারের মোহ ছিঁড়ে-খুঁড়ে পালাতে চেয়েছি!
বাস্তবতা এসে বলল,
আগামীকাল হরতাল।
বিরোধী দল শহর বন্ধ করে জবাব চাইবে।
অধিকারের দাবিতে,
অনিবার্য কারণে,
সমস্ত পথ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ।
আমার যাওয়া হবে না কোথাও।
আমি আক্রোশে ফুসে উঠতে চেয়েও ক্লান্ত হয়েছি।
কী হবে তাতে?
সেই যান্ত্রিক শব্দ,
নির্ঘুম রাতের শেষে,
রোজকার হাজিরা,
ফাইলের নিচে চাপা পড়া দীর্ঘশ্বাস।


শহরে কাক ডাকা ভোর নেই আর।
কাকের অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে কবে!
হারিয়েছে পড়ন্ত বিকেলের রোদ্দুর-মাখা ছেলেমানুষি।

আজ আর কিছু হবো—সেই বাসনাও বেঁচে নেই।
অপেক্ষায় আছি মাটির সাথে বিলীন হওয়ার।
তারপর যদিবা ইচ্ছের ফড়িং আবার দেখা দেয়,
অন্য কোথাও,অন্য কোনো ভুবনে—
আবার দেখা হবে।

কোন মন্তব্য নেই

Raycat থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.